মহাকাশ: উল্টোভাবে সাজানো রহস্যময় গ্রহমণ্ডলী
অনলাইন ডেস্ক: জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবী থেকে প্রায় ১১৭ আলোকবর্ষ দূরে এক অদ্ভুত গ্রহমণ্ডলীর সন্ধান পেয়েছেন, যা গ্রহ গঠনের প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। সাধারণত কোনো তারার কাছাকাছি ছোট, পাথুরে গ্রহ থাকে এবং দূরে থাকে গ্যাসীয় গ্রহ। কিন্তু এই নতুন ব্যবস্থায় দেখা গেছে উল্টো ধরনের বিন্যাস, যেন গ্রহ তৈরির নিয়মই বদলে গেছে।
এই গ্রহমণ্ডলী পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার শিওপস স্পেস টেলিস্কোপ ব্যবহার করে। গবেষণার কেন্দ্রের তারাটি একটি লাল বামন, নাম এলএইচএস ১৯০৩, যা সূর্যের তুলনায় অনেক কম উজ্জ্বল ও কম ভরবিশিষ্ট। এটিকে ঘিরে চারটি গ্রহ আবর্তিত হচ্ছে।
চারটি গ্রহের মধ্যে দুটি পাথুরে এবং দুটি গ্যাসীয়। বিস্ময়ের বিষয় হলো— সবচেয়ে ভেতরের গ্রহটি পাথুরে, মাঝের দুটি গ্যাসীয়, আর সবচেয়ে বাইরের গ্রহটি আবার পাথুরে। প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী, বাইরের গ্রহটির গ্যাসীয় হওয়ার কথা ছিল।
ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইকের জ্যোতির্বিজ্ঞানী টমাস উইলসন ব্যাখ্যা করেন, তারার কাছাকাছি অঞ্চলে তাপমাত্রা এত বেশি থাকে যে গ্যাস বা বরফ টিকে থাকতে পারে না। ফলে সেখানে পাথুরে গ্রহ তৈরি হয়। দূরের ঠান্ডা অঞ্চলে গ্যাস জমে বড় বায়ুমণ্ডলযুক্ত গ্যাসীয় গ্রহ গড়ে ওঠে।
কিন্তু এই ব্যবস্থায় গ্যাসীয় গ্রহের বাইরেও একটি পাথুরে গ্রহ পাওয়া গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, গ্রহগুলো একসঙ্গে নয়, বরং পর্যায়ক্রমে তৈরি হয়েছে। শেষের গ্রহটি হয়তো তখন তৈরি হয়েছে, যখন আশপাশের গ্যাস প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই এটিকে গবেষকরা দেরিতে বিকশিত বা লেট ব্লুমার গ্রহ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট অ্যান্ড্রজের সহ-গবেষক অ্যান্ড্রু ক্যামেরন বলেন, আরেকটি সম্ভাবনা হলো—গ্রহটি প্রথমে বড় গ্যাসীয় বায়ুমণ্ডল নিয়েই জন্মেছিল, কিন্তু পরে কোনো মহাজাগতিক সংঘর্ষে তা হারিয়েছে। পৃথিবী-চাঁদের উৎপত্তি সম্পর্কেও অনুরূপ সংঘর্ষ তত্ত্ব রয়েছে।
সবচেয়ে বাইরের পাথুরে গ্রহটির ভর পৃথিবীর প্রায় ৫.৮ গুণ এবং আনুমানিক তাপমাত্রা প্রায় ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটি পৃথিবীতে রেকর্ড হওয়া সর্বোচ্চ তাপমাত্রার কাছাকাছি। ফলে বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য বাসযোগ্যতার দিক থেকেও গ্রহটিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ভবিষ্যতে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ, যা পরিচালনা করছে নাসা। গ্রহটির বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য দিতে পারে।
এই আবিষ্কার দেখাচ্ছে, গ্রহ তৈরির প্রক্রিয়া আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। লাল বামন তারার চারপাশে এমন উল্টো বিন্যাসের জগৎ ভবিষ্যৎ গবেষণায় নতুন প্রশ্ন তুলবে এবং হয়তো নতুন উত্তরও এনে দেবে।
What's Your Reaction?