ভ্রমণ কাহিনী: 'ঘুরে এলাম তাজহাট'
আমি দেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের যশোর জেলায় বসবাস করি। সাধ ছিল উত্তরবঙ্গের কোথাও ঘুরতে যাওয়া ।সময় করে মায়ের সঙ্গে ট্যুর প্ল্যান করে ফেললাম ।
গন্তব্য রংপুর।
যশোর স্টেশন থেকে উঠে পড়লাম চিলাহাটি গামী রূপসা এক্সপ্রেসে। রাত দশটায় ট্রেন স্টেশনে মাকে নিয়ে বসে আছি ট্রেনের অপেক্ষায় ।হঠাৎ করে হুইসেল বাজিয়ে চলে এল ঝকঝকাচক শব্দ করতে করতে রুপসা এক্সপ্রেস। মনের ভেতরে এক অদম্য আনন্দ খেলছিল ।কেননা a journey always gather new experiences.
আমি আগে কখনো রাত্রে ট্রেনে ভ্রমণ করিনি তাই অন্যরকম অদ্ভুত একটা আনন্দ কাজ করছিল। রাতের অন্ধকারের মাঠের ভেতর দিয়ে শরু পথে এঁকেবেঁকে চলছিল ট্রেন। মনে হচ্ছিল তেপান্তরের কোন এক অজানা শহরে অজানা ভুবনে ঢুকে পড়ছি।
আমাদের গন্তব্য ছিল সান্তাহার পর্যন্ত পৌঁছলাম রাত প্রায় তিনটার দিকে। সান্তাহার এসে অপেক্ষা করলাম রংপুরগামী ট্রেনের জন্য। প্রায় ঘণ্টাখানেক বসে থাকার পরে এলো রংপুরগামী রংপুর এক্সপ্রেস। আমরা উঠে পড়লাম ট্রেনে। ট্রেন এবার ঢুকে পড়ল উত্তরবঙ্গের জনপদে। সান্তাহার, বগুড়া, গাইবান্ধা তারপরে রংপুর এসে পৌঁছলাম ভোরে। স্টেশনে অপেক্ষা করছিল আমাদের রিলেটিভ আমাদেরকে রিসিভ করার জন্য। আমরা গেলাম রংপুর থেকে অটোরিকশা করে মিঠাপুকুরের রানীপুকুর।
বিশ্রাম করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম রংপুরের কিছু দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনে। তার মধ্যে রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর ক্যাডেট কলেজ, রংপুরের বিখ্যাত হাড়িভাঙ্গা আমের বাগান, রংপুর চিড়িয়াখানা ও তাজহাট জমিদার বাড়ি ছিল অন্যতম। যেহেতু আমাদের টুর ছিল মাএ দুই দিনের তাই আর সময় নষ্ট না করে বেড়িয়ে পড়ি।শব্দ সংক্ষেপনের জন্য আমি শুধু তাজহাট জমিদার বাড়িতে আমাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছি।
নারী শিক্ষা জাগরনের অগ্রদুৎ বেগম রোকেয়ার নামানুসারেই রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় এর নামকরণ করা হয়েছে। আমরা রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে অটো রিকশায় চড়ে চলে গেলাম তাজহাট জমিদারবাড়ি। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলাম। গেটে ঢুকতেই রাজবাড়ির সামনে বিস্তৃত মাঠ, ফুলের বাগান, গাছপালা, লাল ফুটন্ত শাপলার পুকুর আমাদেরকে সাদরে আমন্ত্রণ জানালো। এতদিন শুধু রাজা জমিদারদের গল্পই শুনেছি কিন্তু সত্যি যে চোখের সামনে এভাবে কোন জমিদার বাড়ি দেখতে পাবো বিশ্বাসই হচ্ছিল না। সামনের প্রশস্ত বাগান পেরিয়ে হেঁটে চললাম রাজবাড়ীর বিস্তৃত সিঁড়ির দিকে। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে দেখলাম সাদা দেওয়াল আর পাথর রোদের রশ্নিতে যেন প্রকৃতি রাজবাড়ীকে অপরূপ সৌন্দর্যে সাজিয়েছে।
ওপরে ওঠেই সামনে চতুর্দিকে প্রশস্ত বারান্দা এবং সেখানে মন দুলানো হিমেল হাওয়া আমাদের মনে যেন প্রশান্তি এনে দিল। সেখানে বাংলাদেশের মানচিত্র, রংপুরের মানচিত্র, জমিদার বংশের বংশ তালিকা, জমিদার বংশের ছবি সহ রয়েছে একটি প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘর ।জাদুঘরে জুড়ে আছে বিভিন্ন শিলালিপি, প্রস্তর খন্ড, জমিদারদের ব্যবহৃত হাড়ি -পাতিল, শিলা লিপি ও পাতায় লিখিত বিভিন্ন সংস্কৃত, ফার্সি, আরবি হাতের লেখা, বৌদ্ধ মূর্তি , কৃষ্ণমূর্তি সহ ছোট্ট পবিত্র কুরআনুল কারীম সহ অনেক প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন। অতএব বোঝা যায় তখন বিভিন্ন ধর্মের লোক বসবাস করত। সবচাইতে আকর্ষণ আমাকে যেটা করেছিল বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নিজ হাতে লেখা একটি চিঠি যেটা ওখানে না গেলে হয়তো দেখাই হতো না। আমি উচ্ছ্বসিত হয়ে ছবি নিতে গেলাম স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য কিন্তু সেখানের গার্ড আমাদেরকে ছবি তুলতে বাধা দিলেন।
জমিদার বাড়ি সামনে ও পেছনে প্রশস্ত জায়গা পুকুর গাছপালা দিয়ে বেষ্টিত। তবে বর্তমান পর্যটকদের কথা চিন্তা করে জেলা প্রশাসন সেখানে পর্যটকদের বসার জায়গা, পার্কিং এলাকা এবং টয়লেটের সুব্যবস্থা করেছেন।
আমার এই ছোট্ট লেখনীতে আমি আমার ছোট্ট ভ্রমণ কাহিনী শেয়ার করলাম। আমাদের সবার সময় সুযোগ পেলে ভ্রমণ করা উচিত ।কেননা ভ্রমণ জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে। আসুন আমরা ভ্রমণে উৎসাহি হই।
-সানাম আল জান্নাত
দ্বাদশ শ্রেণি, বিজ্ঞান বিভাগ,
সরকারি মহিলা কলেজ, যশোর
What's Your Reaction?