জাকারিয়া হত্যা: ঘটনাস্থলে না থেকেও আসামি!
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী জাকারিয়া খান হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে মামলায় এমন কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে, যারা ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন না-এমন অভিযোগ করেছেন তাদের স্বজনরা। তাদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার ২ অক্টোবর রাত সাড়ে ১১টার দিকে সাতক্ষীরা শহরের পশু হাসপাতালের পাশে একটি চায়ের দোকানে কয়েকজন যুবকের সঙ্গে দোকানির কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে জাকারিয়া দোকানিকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে এক যুবক তার বুকে ও পেটে ছুরিকাঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় নিহতের ভাই শাহারিয়ার খান বাদী হয়ে শনিবার সদর থানায় মামলা করেন। মামলায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৬-৭ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।
মামলার পর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততা যাচাই করতে শহরের ইটাগাছা এলাকার মুহিদ হাসান বনিকে আটক করে পুলিশ। পরে তাকে মামলার ২ নম্বর আসামি করা হয়। তবে বনির পরিবারের দাবি, ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না।
এদিকে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ভোররাতে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও সদর থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে মামলার প্রধান আসামি নাহিদ হাসান (২৬) ও তদন্তে সন্দিগ্ধ অমিত হাসান ওরফে শিপনকে (৩০) গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, ভারতে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিকালে কালিগঞ্জের শুইলপুর গ্রাম থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। নাহিদ জাকারিয়া হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত এক নম্বর আসামি।
জাকারিয়া হত্যার ঘটনায় মঙ্গলবার সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে বিক্ষোভ ও কর্মসূচি পালন করা হয়। সেখানে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানানো হয়।
তবে মামলায় আসামি করা কয়েকজনের স্বজনের দাবি, ঘটনার সময় তারা সাতক্ষীরায় ছিলেন না। তাদের বক্তব্যের সমর্থনে বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইলের অবস্থান যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে মামলার ২ নম্বর আসামি মুহিদ হাসান বনি ইটাগাছায় নিজ বাসায় ছিলেন। পরে রাত ১১টা ২৪ মিনিটে বাসা থেকে বের হয়ে নিউ মার্কেট এলাকার একটি ফলের জুসের দোকানে যান বলে দাবি করা হয়েছে। সেখানে রাত ১১টা ৩৫ থেকে ১১টা ৩৯ মিনিট পর্যন্ত তাকে দেখা যায় বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। পরিবারের দাবি, ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের কারও পোশাকের সঙ্গে বনির পোশাকের মিল নেই।
মুহিদ হাসান বনির মা মাজেদা খাতুন বলেন, “আমার ছেলে সম্পূর্ণ নির্দোষ। ঘটনার সময় সে বাড়িতে আমার পাশেই ছিল। রাতে হঠাৎ পুলিশ এসে তাকে নিয়ে যায়। আমি চাই সঠিক তদন্ত হোক এবং প্রকৃত দোষীদের বিচার হোক। আমার ছেলের ১৪ তারিখ থেকে অনার্স প্রথম বর্ষের পরীক্ষা। সে যাতে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।”
এদিকে মামলার ৫ নম্বর আসামি জুয়েল হোসেনও নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তার ভাষ্য, ঘটনার দিন বিকেল ৫টার দিকে তিনি মাছের গাড়ি নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হন। পরে বিভিন্ন স্থানে টোল দিয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছান। জুয়েল বলেন, “আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। প্রয়োজনে আমার মোবাইলের লোকেশন ও কলের তথ্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করা হোক।”
মামলার ৬ নম্বর আসামি সাগর হোসেনের পরিবারের দাবি, তিনি গত ১৪ সেপ্টেম্বর কাজের উদ্দেশ্যে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে সৌদি আরবে যান এবং বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন। অপরদিকে ৭ নম্বর আসামি রনি সম্প্রতি বিদেশ থেকে দেশে ফিরে বিয়ে করেছেন এবং ঘটনার দিন শ্বশুরবাড়িতে ছিলেন বলে তার পরিবারের দাবি। মামলার ২ ও ৭ নম্বর আসামি আপন ভাই বলেও জানা গেছে।
নিহত জাকারিয়ার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ ও রিফাত বলেন, “জাকারিয়া খুবই সাধারণ একজন শিক্ষার্থী ছিল। সে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল না। ঘটনার সময় গোলযোগ থামাতে গিয়ে সে হামলার শিকার হয়। আমরা দ্রুত, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ আইনানুগ শাস্তি চাই।”
মামলার বাদী শাহারিয়ার খান বলেন, “আমার ভাই একজন সাধারণ কলেজছাত্র। আমি তার হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই। যারা হত্যার সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হোক।”
সাতক্ষীরা সদর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি একটি জনবহুল বাজার এলাকার চায়ের দোকানের কাছে ঘটে। সেখানে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছিল। প্রাথমিকভাবে চা খাওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। জাকারিয়া সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে হামলার শিকার হন।
ওসি আরও বলেন, তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হবে। এরপর আইন অনুযায়ী আদালত পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।
জাকারিয়ার পরিবার ও স্বজনদের দাবি, মামলায় আসামিদের সম্পৃক্ততা যাচাইসহ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
What's Your Reaction?