যন্ত্রণা ভুলে জনপ্রিয় কবি হয়ে ওঠা এক চিকিৎসক 'মণিদীপা বিশ্বাস কীর্তনিয়া'
পার্থ নিয়োগী: পেশায় তিনি ক্রিটিক্যাল কেয়ারের চিকিৎসক। বেশ কয়েক বছর হল তিনি বালুরঘাট হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত আছেন। দিনের বেশিরভাগ সময়ই তাকে রোগীদের নিয়ে কাটাতে হয়। এরই মাঝে সময় করে লেখেন কবিতা। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই বাংলাদেশেও আছে তার কবিতার পাঠক। অথচ স্কুল জীবনে কিংবা ডাক্তারি পড়ার সময়ও তিনি কোনদিন কবিতা লেখেননি। তবে ছোটবেলা থেকেই বই পড়তেন তিনি। বাড়িতে ছিল সাহিত্য, সংস্কৃতির চর্চা। যা তার মধ্যে অনেকটাই প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু কবিতা লেখা শুরু করার পেছনে তার জীবনে একটি ঘটনা আছে।
২০১০ সালে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় তার ডান হাতটি গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যায়। হাত অপারেশনের সময় চিকিৎসকরাও নিশ্চিত ছিলেন না তার হাত ঠিক হয়ে যাবার ব্যাপারে। অপারেশনের পর তার ডান হাতে হত প্রচন্ড যন্ত্রণা। আর সেই যন্ত্রণা সহ্য করা ছিল খুব কঠিন। আর সেই ব্যাথার তীব্র যন্ত্রণা থেকে মনকে অন্যদিকে চালিত করতে শুরু করেন কবিতা লেখা। হাত দিয়ে সেসময় লিখতে খুব কষ্ট হত। তাই মোবাইলের কি-বোর্ডে কোনরকমে আঙ্গুল চালিয়ে লিখতেন কবিতা। এমনই করে লিখে ফেলেছিলেন বেশ কিছু কবিতা।
একটা সময় তার বন্ধুদের নজর পড়ে যায় সেই কবিতার প্রতি। তাদের কাছে কবিতাগুলি খুব ভাল লাগে। বন্ধুরাই তার কবিতাগুলি বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে পাঠাতে শুরু করেন। আর সেই লিটল ম্যাগাজিনগুলিতে মণিদীপার কবিতাগুলি ছাপতেও শুরু হয়। পাঠকমহলে তার কবিতাগুলি বেশ সাড়া ফেলে দেয়। এইভাবে কবি হিসেবে তার নাম হতে শুরু হয়। কবিতা আরও ভাল করে লেখবার জন্য এরপর ডাক্তারির সময়ের পর সময় বের করে নিয়ে কবিতা নিয়ে তিনি পড়াশোনা শুরু করেন। শেখেন ছন্দ। এরপর দেশ, এই সময়ের মত জনপ্রিয় পত্রিকা থেকেও চ্ছাপা হতে শুরু করে তার কবিতা। তার কবিতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার ব্যাক্তিগত চিকিৎসক জীবনের উপলব্ধি খুব সুন্দরভাবে তার কবিতার মধ্যে উঠে আসে। যেহেতু তিনি একজন ক্রিটিক্যাল কেয়ারের চিকিৎসক। তাই গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা তাকে করতে হয়। তাই জীবন মৃত্যুর মাঝখানে থাকা রোগীদের লড়াই তার কবিতায় ফুটে ওঠে। আসলে কবিতা মানে খালি প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি নয়। মানুষের লড়াই এর কথা তুলে ধরাও কবিতাও। আর সেটাই তিনি টূলে ধরেন অনবদ্যভাবে তার কবিতায়। এখানেই তার স্বতন্ত্রতা। দেবারতি মিত্র, রাহুল পুরকায়স্থ এর মত আরও অনেক কবির কবিতা তার পছন্দের তালিকায়। এখন পর্যন্ত তার সাতটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিটি কাব্যগ্রন্থই পাঠক মহলে সমাদৃত হয়েছে।
বাংলাদেশের অনেকেই তার বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থ কিনেছেন এবং তার কবিতার প্রশংসাও করেছেন। বাংলাদেশেও তার পাঠক আছে শুনে আনন্দিত মণিদীপা বিশ্বাস কীর্তনিয়া। এই নিয়ে তার বক্তব্য- আমরা দুই বাংলা মিলে যদি একসাথে কবিতা চর্চা করি তবে সমৃদ্ধ হবে বাংলা কবিতা। একইসাথে বাংলাদেশের গদ্য ও কবিতায় বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার তাকে ছুঁয়ে যায় বলে তিনি জানান।
নতুন প্রজন্মের কবিদের প্রতিও তার অসম্ভব ভালবাসা। নতুন জারা কবিতা লিখতে শুরু করেছে তাদের প্রতি তার কি পরামর্শ? তা জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, "জীবনে যে কোন কাজ করতে হলে খুব ভাল মতন পড়াশোনা করা দরকার। আর এই কথার ব্যাতিক্রম নয় কবিতা লেখাও। তাই নতুন প্রজন্মের কবিদের কবিতা নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করতে তিনি বললেন'’। ডাক্তারির পাশাপাশি কবিতাকে নিয়েও আগামীতে এগিয়ে যাওয়া তার লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্যেই নীরবে এগিয়ে চলেছেন চিকিৎসক তথা কবি ডাক্তার মণিদীপা বিশ্বাস কীর্তনিয়া ।
What's Your Reaction?