খালেদা জিয়ার নাম থাকায় ১৭ বছর সংস্কার হয়নি ছাত্রী নিবাস 

Apr 22, 2026 - 21:29
Apr 22, 2026 - 21:31
 0
খালেদা জিয়ার নাম থাকায় ১৭ বছর সংস্কার হয়নি ছাত্রী নিবাস 
ছবি: সংগৃহীত

মিজানুর রহমান মিলন, নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি : সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামে ছাত্রী নিবাসের নামকরণ থাকায় সৈয়দপুর মহিলা মহাবিদ্যালয় রাজনৈতিক রোষানলের শিকার হয়েছে। আওয়ামী শাসনামলের ১৭ বছর কোন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি কলেজটিতে। কলেজ কর্তৃপক্ষ একাধিকবার ভবনটি সংস্কারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করলেও কোন লাভ হয়নি সে সময়। ফলে সংস্কারের অভাবে কলেজের ছাত্রী নিবাস বেহাল হয়ে পড়ে থাকে। ফলে আবাসিক শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাত্রী নিবাসে বসবাস করছে। একইভাবে একাডেমিক ভবনের দশাও করুণ। এ অবস্থায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর খালেদা জিয়া ছাত্রী নিবাসটির সংস্কারের জন্য দুই দফা আবেদন করা হয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে। সেখান থেকে বলা হয়েছে চলতি সালের জুন মাসে বরাদ্দ সাপেক্ষে ভবনটি সংস্কারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।  

জানা যায়, বিএনপি সরকারের আমলে ১৯৯৫ সালের ২৫ মার্চ সংসদ সদস্য অধ্যাপক আব্দুল হাফিজ ছাত্রীদের আবাসন সমস্যার সমাধানে চার তলা ভবনের ছাত্রী নিবাস নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। এটির নামকরণ করা হয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামে।
কিন্তু নির্মাণ কাজ চলা অবস্থায় আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতাসীন হলে শুধু নামের কারণে বরাদ্দ বাতিল করে আওয়ামীলীগ। সে সময় কলেজ কর্তৃপক্ষ কাজ শুরুর বিষয়ে অনেক দেন দরবার করেও কোন ফল পাননি তারা। আওয়ামীলীগের রোষানলে পড়ে নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে যায় ছাত্রী নিবাসটির,পড়ে থাকে অসমাপ্ত অবস্থায়। পরে ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর পুনরায় খালেদা জিয়া ছাত্রী নিবাসের কাজ শুরু হয়। ২০০৩ সালে এটির নির্মাণ কাজ শেষ হলে ওই বছরের ১৪ অক্টোবর ছাত্রী নিবাসের উদ্বোধন করেন সেই সময়ের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী (বর্তমানে শিক্ষামন্ত্রী) আ.ন.ম.এহসানুল হক মিলন। 
পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের ১৭ বছরে খালেদা জিয়ার নামের কারণে কোন সংস্কার কাজই হয়নি ছাত্রী নিবাসটির। এমনকি কলেজের একাডেমিক ভবনে কোন উন্নয়ন কাজ হয়নি। 

এদিকে দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ছাত্রী নিবাসটি বসবাস অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় কলেজ কর্তৃপক্ষের অনেক দৌড়ঝাঁপের পর ২০২৪ সালের প্রথম দিকে ছাত্রী নিবাস সংস্কারে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু খালেদা জিয়ার নাম থাকায় পরে ওই বরাদ্দও বাতিল করা হয়। ফলে কলেজটি আওয়ামী সরকারের সময়ে রোষানলে পড়ে উন্নয়ন বঞ্চনার শিকার হয়। বর্তমানে ছাত্রী নিবাসটি নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে। ছাত্রী নিবাস ভবনের ছাদ ও দেওয়ালে পলেস্তরা খসে পড়ছে, কোন কোন জায়গায় ফাটলও ধরেছে। দরজা, জানালার অবস্থাও নড়বড়ে, আসবাবপত্রও নষ্ট হয়ে গেছে| কিচেন ও ডাইনিং রুমের অবস্থাও করুণ, সেখানে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। পড়াশোনার ফাঁকে খেলাধুলার জন্য নেই কোন খেলার সামগ্রী। সবমিলিয়ে বেহাল অবস্থার কারণে ছাত্রী নিবাসটির আবাসিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। অনেকে থাকার দূরাবস্থা দেখে বেসরকারী হোস্টেলে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
সুত্র জানায়, চার তলা ভবনে ছাত্রীদের জন্য ৮৪টি আসন থাকলেও বর্তমানে রয়েছে ৫০ জন শিক্ষার্থী। এতে আবাসিক শিক্ষার্থীদের এককালীন ভর্তি ফি দুই হাজার ৫০০ টাকা, সিট ভাড়া মাসিক ৮০০ টাকা এবং প্রতিদিনের খাবারের জন্য দিতে হয় ১০০ টাকা। কর্মচারী রয়েছেন ৫ জন। এদের মধ্যে রয়েছেন ২ জন রাঁধুনি, ১ জন মেট্রোন, ১ জন নাইট গার্ড ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী ১ জন। তাদের জন্য বাড়তি কোন বরাদ্দ না থাকায় এসব কর্মচারীদের বেতন দিতে হয় ছাত্রী নিবাসের শিক্ষার্থীদের ভর্তি ফি, সিট ভাড়া ও খাবারের বিল থেকে। কিম্তু আবাসিক শিক্ষার্থী কম থাকায় কর্মচারিরা যা বেতন পায় তা একেবারে অপ্রতুল।  

কলেজের আবাসিক ছাত্রী হাবিবা আক্তার জানান, আমরা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছি, কারণ ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে প্রায় সময়, দরজা-জানালাও ঠিক নেই। পানির লাইন অকেজো, পানিও ঠিকঠাক পাওয়া যায় না। উপায় নেই তাই কষ্ট করে থাকতে হচ্ছে। মেঘলা নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, দীর্ঘদিন হলের সংস্কার না হওয়ায় ভবনটি এখন থাকার যোগ্য নেই। রুমের খাট, টেবিল, চেয়ার নষ্ট হয়ে গেছে, পর্যাপ্ত সিলিং ফ্যান নেই, যে কয়টা আছে, সেসবও ঠিকমত কাজ করে না। গরমে খুব কষ্টভোগ করতে হচ্ছে আমাদের।

শিক্ষার্থী হ্যাপী রানী জানান, আমাদের ছাত্রী নিবাস ও একাডেমিক ভবনের রং পলেস্তারা উঠে যাচ্ছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সংস্কারের কোন উদ্যেগ নিচ্ছে না| আমার দাবি এর দ্রুত সংস্কার করা হোক।

সৈয়দপুর মহিলা মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক সুফিয়া বেগম বলেন, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ভবন ও ছাত্রী নিবাসের পরিবেশ হতে হবে মানসম্মত। শিক্ষার্থীদের পাঠদান কক্ষ পরিপাটি হওয়া জরুরী। আর আবাসিক হল মনোরম না হলে মনোযোগ বিঘ্নিত হয়|। অথচ খালেদা জিয়া নামের কারণে দীর্ঘ ১৭ বছরেও এসবের কোন সংস্কার করা হয়নি। এতে করে শিক্ষক শিক্ষার্থীরা নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ছাত্রী নিবাসের হোস্টেল সুপার প্রভাষক অমিত গুপ্ত জানান, দীর্ঘ ১৭ বছরে খালেদা জিয়া ছাত্রী নিবাসটি সংস্কার না হওয়ায় বেহাল অবস্থায় রয়েছে ভবনটি। ঝুঁকি নিয়ে সেখানে অবস্থান করছে আবাসিক শিক্ষার্থীরা। তাদের দেখভাল, রান্না, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা প্রদানে যে ৫ জন কর্মচারী রয়েছে, তাদের বেতন ছাত্রী নিবাসের আয় থেকেই দিতে হয়। বাড়তি বরাদ্দ না না থাকায় তাদের বেতন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছেনা।

সৈয়দপুর মহিলা মহাবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো.শাহীদ শাহাব বলেন, শুধুমাত্র খালেদা জিয়া নামের কারণে আওয়ামী রোষানলে পড়ে ১৭ বছরে ছাত্রী নিবাসের কোন সংস্কার হয়নি। ২০২৪ সালের শুরুতে ভবনটির উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তালিকাভুক্ত হলেও সেটিও বাতিল করা হয়। তিনি আরও বলেন, অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় ছাত্রী নিবাসের সংস্কারের জন্য শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে আবেদন করা হলে তারা সংস্কারের আশ্বাস দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছেন। তবে তিনি আশা করছেন বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সম্মানে ছাত্রী নিবাসটি সংস্কার ও উন্নয়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিবেন। 



What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow