শিকিয়াঝোরা এখানে আছে এমাজনের ছোয়া 

Apr 6, 2026 - 17:49
 0
শিকিয়াঝোরা এখানে আছে এমাজনের ছোয়া 
ছবি: সংগৃহীত

দেবজিৎ নন্দী : উত্তরবঙ্গ তার পাহাড়ি প্রান্ত বিস্তৃত চা বাগান ও অরণ্য এবং নদীমুখী দৃশ্যের জন্য সুপরিচিত। কিন্তু এর মাঝে কিছু স্থান রয়েছে যা পর্যটকরা কমই খুঁজে পান এর মধ্যে একটি হলো সিকিয়াঝরা এক অজানা সৌন্দর্য যেখানে প্রকৃতি এবং স্থানীয় সংস্কৃতির মিলন ঘটে এক অপরূপ সমন্বয়ে।

অনেকেই একে ডুয়ার্স এর আমাজন বলেন, মূলত আলিপুরদুয়ার জেলার বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প এর পাশেই হলো সিকিয়াঝরা এর অবস্থান আবার কিছুটা পেরিয়ে গেলেই জলদাপাড়া ন্যাশনাল পার্ক এর অন্তর্গত চিলাপাতা ফরেস্ট। সিকিয়াঝোরার মাঝে দিয়ে বয়ে গেছে বালা নদী যেটা মূলত জয়ন্তী ঢাল এবং বক্সা বনাঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয় বা এর মধ্যে দিয়ে বয়ে যায়। যদিও ঝোরা মানেই একটা সরু নদী ই হলো। জীববৈচিত্রতে সমৃদ্ধ এই জায়গা দেখলে সাধারণ মনে হলেও নৌকা নিয়ে জঙ্গল সাফারি এর অভিজ্ঞতা মূলত এখানেই দেখা যায়। আমরা সবাই জঙ্গল সাফারি সাধারণত গাড়িতে করেই অভ্যস্ত তবে যদি নদী এবং তার সাথে জঙ্গল সাফারি এর অভিজ্ঞতা নিতে হয় এর জন্য এই জায়গা টি সত্যি অসাধারণ এবং চোখ মেলে তাকালে কখনও দেখা যায় হরিণের ছায়া কখনও বুনো শূকর আবার ভাগ্য ভালো হলে দূরে হাতির চলার শব্দও শোনা যেতে পারে। আর পাখি? এই জঙ্গলে পাখির সংখ্যা এত বেশি যে কখনও কখনও মনে হয় যেন এক অদৃশ্য অর্কেস্ট্রা চলছে। 

আজ আমার এই ভ্রমন অভিজ্ঞতা লিখবো শুধু আপনাদের জন্য। ছোট এই নদীটি "নৌকা সাফারি" এর মাধ্যমে পর্যটক দের মাঝে এক নতুন ধরনের উত্তেজনা এবং আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। ফলে সিকিয়াঝোরা আজ ডুয়ার্স ভ্রমণপিপাসু দের মধ্যে এক আকর্ষণীয় স্থান। এবং যারা প্রকৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করতে চান জঙ্গলের নিস্তব্ধতা আর পাখির ডাকের মধ্যে কিছু সময় কাটাতে চান তাদের জন্য উত্তরবঙ্গের এই সিকিয়াঝোরা হতে পারে এক অসাধারণ গন্তব্য।

জীববৈচিত্র বলতে একদিকে জলদাপাড়া রেঞ্জ এর চিলাপাতা ও এক দিকে বক্সা টাইগার রিসার্ভ খুবই বেশি দূর নয় মোটামুটি ৫০কিলোমিটার এর মাঝে।দুটোই বক্সা আর একটু কাছেই হবে। এই যে নৌকা সাফারি এর কথা বললাম এটা এখানকার এক স্থানীয় স্ব-উন্নয়ন সংগঠন দ্বারা পরিচালিত আপনাকে টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হবে এবং নৌকা সাফারি এর একটা ফী ধার্য করা আছে তবে হ্যা এই নৌকা নিয়ে যখন এই জলের সরু পথ ধরে এগোনো হয় তখন মনে হয় যেন জঙ্গলের বুক চিরে এক অজানা অভিযানে বেরিয়েছেন সেই বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় এর "আমাজন অভিযান" মনে হতেই পারে ছোটমোট একটা ও সাথে ভাগ্যে থাকলে আপনি এখানে আপনি নানা বনজ পাখি যেমন - গ্রীনটেইল বিইটার ও লেসার হুইসলিংক সাথে অন্যান্য বন্যপ্রাণীর যেমন বন্য শূকর বা হাতিরও সন্ধান পাবেন বা আওয়াজ ও শুনতে পারেন। নদীর দু’পাশে ঘন জঙ্গল এবং সাথে মাঝি বা নৌকার চালকরা সেই নদীর গল্পের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় বহু প্রাচীন লোককথার। নৌকা সাফারি শুরু হয় নদীর প্রবাহে ভেসে সাথে যত দূরে এগোনো যায় ততই জঙ্গল গাঢ় ও রহস্যময় হয়ে ওঠে। মাঝে মাঝে চোখে পরতে পারে বুনো শুকর বা অন্যান্য বন্যজন্তু অথবা উড়ন্ত পক্ষীর ঝাঁক। নদীর জলে প্রতিবিম্বিত হয় সূর্যের আলো যা নৌকার ধাতব পেছনে খেলার মতো নাচে। সফরকালে মাঝি আমাদের বিভিন্ন গল্প বলেন বন দেবী এর কথা এবং নানা অজানা লোককথার গল্প এই সব কাহিনী শুনতে শুনতে নৌকা থমথমে হয়ে যায় যেন সময় নিজেই স্থির। 

সিকিয়াঝরাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারও নানা উদ্যোগ নিয়েছে। বন দপ্তরের তত্ত্বাবধানে এবং স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণে এই প্রকল্পটি ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছে। মূল লক্ষ্য হচ্ছে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় একটি ভ্রমণকেন্দ্র তৈরি করা কিন্তু সেই সঙ্গে জঙ্গলের স্বাভাবিক পরিবেশ,বন্যপ্রাণী এবং জীববৈচিত্র্য যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। এই প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। নৌকা চালানো বা পর্যটকদের গাইড হিসেবে কাজ করা, ছোটখাটো খাবারের দোকান বা হস্তশিল্পের পসরা সাজানো এইসব নানা উপায়ে এলাকার মানুষ সরাসরি এই পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। ফলে একদিকে যেমন পর্যটনের প্রসার ঘটছে ঠিক তেমনই স্থানীয় অর্থনীতিও ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। সব মিলিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে সিকিয়াঝরা ডুয়ার্সের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইকো-ট্যুরিজম হিসেবে গড়ে উঠছে বা উঠেছে।

এখানে বড় রেস্টুরেন্ট বা শহুরে কোলাহল নেই। বরং নদীর ধারে কয়েকজন স্থানীয় দোকানি ছোট ছোট স্টলে চা,মুড়ি,ঘুগনি বা হালকা খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেন। জঙ্গল থেকে ফিরে গরম চায়ের কাপ হাতে বসে থাকা এই সরল অভিজ্ঞতাই যেন ভ্রমণকে আরও সত্যিকারের করে তোলে।

- কিভাবে পৌঁছাবেন -

আলিপুরদুয়ার থেকে অটো বা গাড়ি ভাড়া করে আপনি খুব তাড়াতাড়ি সিকিয়াঝরা পৌঁছাতে পারবেন। আলিপুরদুয়ার থেকে সিকিয়াঝোরার দূরত্ব প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার যা স্থানীয় গাড়িতে খুব বেশি সময় লাগে না। সবচেয়ে কাছের বিমানবন্দর হল বাগডোগরা যা ১৮২ কিমি দূরে। এই সিকিয়াঝরা যাওয়ার পথ টি এত্তটাই সুন্দর যেটা আপনার মন জয় করবে এটা নিশ্চিত।

শিকিয়াঝরা হলো সেই স্থান যা প্রকৃতি,সংস্কৃতি, এবং শান্তির এক অপরূপ মিশ্রণ। এখানে একবার এসে আপনি শুধু সুন্দর দৃশ্যই দেখবেন না বরং স্থানীয় আতিথেয়তার সঙ্গে একটি মধুর সংযোগও পাবেন। উত্তরবঙ্গ ভ্রমণকারী যেকোনো প্রকারের ভ্রমণপিপাসুর জন্য এটি একটি অপরিহার্য গন্তব্য। ডুয়ার্সে যদি কখনও যান আর একটু আলাদা রকম অভিজ্ঞতা খুঁজে থাকেন তাহলে সিকিয়াঝরার এই ছোট্ট নৌকা যাত্রা আপনাকে হয়তো কয়েক ঘণ্টার জন্য সত্যিই ভুলিয়ে দেবে যে আপনি সভ্যতার এত কাছে আছেন। 

তবে প্রকৃতির এই সুন্দর ভান্ডারকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার। তাই সিকিয়াঝরায় ভ্রমণে এসে পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, জঙ্গলের নিয়ম মেনে চলা এবং বন্যপ্রাণীদের বিরক্ত না করার মতো বিষয়গুলোও অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।

এখানে বড় রেস্টুরেন্ট বা শহুরে কোলাহল নেই। বরং নদীর ধারে কয়েকজন স্থানীয় দোকানি ছোট ছোট স্টলে চা,মুড়ি,ঘুগনি বা হালকা খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেন। জঙ্গল থেকে ফিরে গরম চায়ের কাপ হাতে বসে থাকা এই সরল অভিজ্ঞতাই যেন ভ্রমণকে আরও সত্যিকারের করে তোলে।

- থাকার জায়গা -

সিকিয়াঝরা ভ্রমণে গেলে থাকার ব্যবস্থাও এখন ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে। প্রকৃতির একেবারে কাছাকাছি থাকার অভিজ্ঞতা দিতে এখানে বেশ কিছু ছোট ছোট হোমস্টে তৈরি হয়েছে, যেখানে স্থানীয় মানুষের আতিথেয়তায় কয়েকটা নিরিবিলি দিন কাটানো যায়। এর মধ্যে আমার চোখে পড়েছিল একটি হোমস্টে “সিকিয়াঝরা নেচার ক্যাম্প”। জঙ্গলের পরিবেশের মধ্যেই তৈরি এই হোমস্টেটি পথ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখেছিলাম। যারা সিকিয়াঝরার বোট সাফারি ও আশপাশের প্রকৃতি উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য এটি একটি সুবিধাজনক থাকার জায়গা হতে পারে। এখানে থাকার বা বুকিং সংক্রান্ত তথ্য জানতে যোগাযোগ করা যেতে পারে এই নম্বরগুলিতে 7001164148 / 9733282722। আমি এই নাম্বার গুলো এদের ফেইসবুক পেজ থেকে পেয়েছি।

এছাড়াও যারা একটু সরকারি পর্যটন ব্যবস্থার মধ্যে থাকতে চান তাদের জন্য কাছেই রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বনদপ্তরের কয়েকটি সুন্দর ফরেস্ট রিসোর্ট। ওয়েস্টবেঙ্গল ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট পরিচালিত এই রিসোর্টগুলো মূলত ডুয়ার্সের জঙ্গলের অভিজ্ঞতাকে আরও কাছ থেকে উপভোগ করার সুযোগ করে দেয়। কাছাকাছি এলাকায় অবস্থিত বক্সা টাইগার রিসার্ভ এর রাজাভাতখাওয়া বক্সা জঙ্গল লজ এবং চিলাপাতা ফরেস্ট এর মালঙ্গি লজ এই দুই জঙ্গলেই বনদপ্তরের নিজস্ব আবাসন রয়েছে যেগুলো সিকিয়াঝরা থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই আপনারা ডিপার্টমেন্ট এর সাইট থেকেই বুকিং করতে পারবেন wbfdc.net এই ওয়েবসাইট থেকে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow